রাশিয়ার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা আরো ছয় মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ২৭টি দেশের জোট ইইউ। এর ফলে মস্কোর ওপর পূর্বে আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো অন্তত ২০২৬ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি ইউরো বেশি মূল্যমানের সম্পদ জব্দ করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। তখন থেকেই রাশিয়ার অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রতি ছয় মাস পর পরই এই নিষেধাজ্ঞা নবায়ন করা হয়। সেইসঙ্গে আরোপিত হয় নতুন খাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা।
পশ্চিমা এই বিপুল নিষেধাজ্ঞার মুখেও ভেঙে পড়েনি রাশিয়ার অর্থনীতি। তবে পশ্চিম থেকে ঘুরে পূর্বমুখী হয়েছে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্ক।
২০২১ সালে রাশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশই গিয়েছিল ইউরোপীয় দেশগুলোতে, যার মধ্যে ছিল বেলারুশ ও ইউক্রেনও। এসব রপ্তানির বড় অংশ ছিল অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জ্বালানি পণ্য। ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের পর রপ্তানির সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। অর্থনৈতিক জটিলতা পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ভারত এখন রাশিয়ার প্রধান রপ্তানি বাজার। রাশিয়ার মোট রপ্তানীর ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাশিয়ার সঙ্গে আর ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করত, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে কমেছে ৯০ শতাংশ। নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা চীন, তুরস্ক, কাজাখস্তানের মতো দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। তুরস্ক ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোর সঙ্গেও রুশ বাণিজ্যেও হালকা প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই সবচেয়ে বড় কৌশলগত রূপান্তর ঘটেছে চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া এখন প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ, শিল্পপণ্য—এসবের জন্য চীনের উপর নির্ভর করছে। ২০২৩ সালে রাশিয়ার আমদানির ৫৩ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ২০২১ সালে যা ছিল মাত্র ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাজ্য মিলে ২০২১ সালে রাশিয়ার আমদানির এক-তৃতীয়াংশ জোগান দিত, কিন্তু ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ২০ শতাংশেরও নিচে।
এছাড়াও চীন রাশিয়াকে ধাতু, প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও টেক্সটাইল পণ্যও রপ্তানি করেছে বিপুল পরিমাণে। শুধু নিজস্ব পণ্যই নয়, বরং পশ্চিমা দেশে তৈরি কিছু ডুয়েল-ইউজ পণ্য যেগুলোর বেসামরিক ও সামরিক উভয় ব্যবহার সম্ভব সেসবও রাশিয়ায় পাঠাতে সাহায্য করছে।
তবে বছরের পর বছর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক একঘরে অবস্থান সত্ত্বেও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতি অবশেষে ক্লান্তির লক্ষণ দেখাতে শুরু করেছে। ইউক্রেনে চলমান আগ্রাসনের মধ্যে ক্রেমলিনের অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় এখন দেশের শ্রম সংকট ও মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা এখন বলছেন, দেশটি মন্দার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। মন্দার আশংকার কথা স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী ম্যাক্সিম রেশেতনিকভও।
দেশটির মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে জুনে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ‘মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য’ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।